Friday, May 22, 2015

সমাজ সংস্কারে রসূল সা. এর লক্ষ্য

No comments :
রসূল সা.-এর জীবনী থেকে যথার্থ উপকারিতা অর্জনের জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটার জবাব জানা জরুরী, তা হলো, রসূল সা. এর সামনে ইপ্সিত পরিবর্তনের পরিধি কতদূর এবং তাঁর কাজের মানদণ্ড কী ছিল? সমাজ ব্যবস্থায় তিনি কি কোন আংশিক পরিবর্তন চাইতেন, না সর্বাত্মক পরিবর্তন? তাঁর দাওয়াত কি নিছক ধর্মীয় ও নৈতিক সংস্কারের মধ্যে সীমিত ছিল, না রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্নও ছিল? অন্য কথায়, সামাজিক পরিমণ্ডলে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য কী ছিল?

এ প্রশ্নের জবাব খোদ কুরআনে খুব সুষ্ঠুভাবেই দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ভংগীতে বারবার ইসলামী দাওয়াতের উদ্দেশ্য জানানো হয়েছে। এখানে আমি শুধু দুটো আয়াতের উল্লেখ করছি। এক জায়গায় সকল নবী ও রসূলকে প্রেরণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে এভাবেঃ

﴿لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ﴾

‘‘আমি আমার রসূলগণকে কেবলমাত্র এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছি এবং তাদের ওপর কিতাব ও মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানবজাতি ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। (সূরা আল হাদীদঃ ২৫)

কথাটা একেবারে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে। ইসলামের দাওয়াতের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানব জীবনকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং সমাজ ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করা। একই উদ্দেশ্যে লোহার অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করার ইংগিত আয়াতের পরবর্তী অংশে রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামী বিধিব্যবস্থার বাস্তবায়ন, সংরক্ষণ ও বিকাশ সাধনের জন্য সামরিক শক্তিও অনিবার্য।

স্বয়ং মুহাম্মদ সা. নবী হিসাবে আবির্ভাবের উদ্দেশ্য আরো স্পষ্ট ভাষায় একাধিকবার বলা হয়েছে। যেমনঃ

﴿هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ﴾

‘‘তিনিই আল্লাহ, যিনি স্বীয় রসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি এই সত্য দ্বীনকে অন্য সমস্ত ধর্মমত ও জীবন ব্যবস্থার ওপর বিজয়ী করে দিতে পারেন। চাই তা মোশরেকদের কাছে যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন।’’ (সূরা আস সফঃ ৯)

অর্থাৎ কুরাইশ ও আরবের অন্যান্য মোশরেকরা তো নিজেদের জাহেলী জীবন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেই। জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে যে আওয়াজই তোলা হোক, তা তাদের কাছে অপসন্দ হবেই। কিন্তু এইসব পসন্দ অপসন্দের তোয়াক্কা না করে এবং তাদের বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে রসূল সা. কে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের কাজটা সুসম্পন্ন করতেই হবে। ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্য যদি এটা না হতো, তাহলে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, জেহাদ ও হিজরতের অবকাশ কোথা থেকে হতো? জান ও মালের কুরবানীর আহ্বান কেন জানানো হলো? কী উদ্দেশ্যে ‘‘আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও’’ এই উদাত্ত আহ্বান জানানো হলে? কী উদ্দেশ্যে ‘‘আল্লাহর দল’’ গঠিত হয়? কোন্ লক্ষ্যে শহীদদেরকে বাছাই করা হয়? বস্তুত ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্য অন্তরে বদ্ধমূল না করে কুরআন ও সীরাত এই দুটোর কোনটাই বুঝা যাবেনা।

এবার আসুন, রসূল সা.-এর জীবনেতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় পর্যালোচনা করে অনুসন্ধান চালানো যাক যে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য কী ছিল?

রসূল সা. প্রাথমিক স্তরেই বনু হাশেম গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের একটি বৈঠক আহ্বান করেন নিজের দাওয়াত পেশ করার জন্য। সেখানে তিনি সংক্ষেপে বলেন যে, এই দাওয়াত দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। এর অনেক দিন পরে এক কুরাইশ প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনা করার সময় তিনি ঐ বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেনঃ

(আরবি*****************************)

‘‘আমি যে দাওয়াত পেশ করছি তা যদি তোমরা গ্রহণ করে নাও, তাহলে তাতে তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।’’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম জিল্দ, পৃঃ ৩১৬)

‘দুনিয়ার কল্যাণ’ এই সহজ সরল শব্দ দুটিকে কোন আংশিক কল্যাণের অর্থে গ্রহণ করা একেবারেই অযৌক্তিক। আংশিক কল্যাণ তো প্রত্যেক দাওয়াতেই থাকে। প্রত্যেকটা খারাপ ব্যবস্থায়ও কিছু না কিছু ভালো জিনিস থাকে। আসলে দুনিয়ার কল্যাণের অর্থ হলো দুনিয়ার জীবনটা সর্বাঙ্গীন সুন্দর হওয়া। সমাজ ব্যবস্থাটা নিষ্কলুষ ও নিখুঁত হওয়া। ন্যায় বিচারের স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং পবিত্র ও নির্মল জীবনের অধিকারী হওয়া।

কুরাইশদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে আরো একবার রসূল সা. এর সাথে তাদের আলাপ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এবারেও তিনি বলেনঃ

(আরবি***************************)

‘‘একটি মাত্র কথা যদি তোমরা আমাকে দাও, তবে তা দ্বারা তোমরা সমগ্র আরব জাতির ওপর আধিপত্য লাভ করবে এবং যত অনারব জাতি পৃথিবীতে আছে তারা সব তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে।’’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম জিলদ, পৃঃ ৩১৬)

প্রতিটি মেলা ও হজ্জের সময় আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিভিন্ন গোত্রের শিবিরে শিবিরে গিয়েও তিনি এই বক্তব্য প্রত্যেক গ্রোত্রপতির কাছে রাখতেন। তাদেরকে বলতেন, ‘‘আমাকে সাথে নিয়ে চলুন। আমাকে কাজ করার সুযোগ দিন এবং আমার সাথে সহযোগিতা করুন, যেন আমি সেই বার্তাটা জনগণের কাছে স্পষ্ট করে পেশ করতে পারি, যার জন্য আমাকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে।’’ [বনু আমের গোত্রের যারা হজ্জ করতে গিয়েছিল, তারা ফিরে এসে জানিয়েছেঃ ‘‘মুহাম্মদ (সা) আমাদেরকে অনুরোধ করেছিল আমরা যেন তার নিরাপত্তা বিধান করি, তার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং আমাদের এলাকায় তাকে নিয়ে আসি।’’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় জিলদ, পৃঃ ৩৪)] এই বক্তব্য শুনে ও রসূল সা. এর আবেগ উদ্দীপনা দেখে বনু আমের গোত্রের গোত্রপতি বুখাইয়া বিন ফিরাস এত অভিভূত হলেন যে, তিনি নিজের ঘনিষ্টজনদের কাছে বললেনঃ এই যুবককে হাতে পেলে আমি সমগ্র আরবকে গ্রাস করে ফেলতে পারবো।’’ রসূল সা.-এর দাওয়াতের লক্ষ্য ও তাঁর তৎপরতার সম্ভাব্য ফলাফল এই বিচক্ষণ আরব সরদার বুঝে ফেলেছিলেন। তাই তিনি রসূলের সাথে একটা দর কষাকষি করতে চাইলেন। তিনি রসূল সা. কে জানালেন যে, তিনি একটি শর্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। সেটি হলো, আপনি যখন আপনার বিরোধীদের ওপর বিজয় লাভ করবেন এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবেন, তখন আপনার পরে আমরা ক্ষমতাসীন হব।’’ বুখাইরা যে অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রসূল সা. যদি সংকীর্ণ অর্থে নিছক ধর্মীয় প্রচারক ও ওয়ায নসীহতকারী হতেন, এবং কোন রাজনৈতিক লক্ষ্য তাঁর একেবারেই না থাকতো, তাহলে পরিষ্কার বলে দিতেন যে, আরে ভাই, আমি তো আল্লাহ ওয়ালা মানুষ। ক্ষমতার বখরা দিয়ে আমার কী কাজ? রাষ্ট্র ও সরকারের সাথে আমার কিসের সম্পর্ক? কিন্তু রসূল সা. এভাবে জবাব দেননি। তিনি বললেন”

‘‘ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে। ওটা তিনি যাকে দিতে চান তাকেই দেবেন।’’

এ কথা বলেই তিনি বুখায়রার শর্ত ও ক্ষমতা ভাগাভাগির বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে দিলেন। (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় জিল্দ পৃঃ ২৩)

রাসূল সা. এর নেতৃত্বে আন্দোলন চলাকালে “আরব ও অনারবদের ওপর কর্তৃত্ব লাভ”- এর বিষয়টি এত খ্যাতি লাভ করে যে, ওটা যেন ইসলামী আন্দোলনের শ্লোগানে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। শিশুরা পর্যন্ত ওটা বলাবলি করতো। বিরোধীরা এটাকে একটা উপহাসের ব্যাপার হিসাবে গ্রহণ করেছিল। দাস ও দরিদ্র শ্রেণীর যে সব যুবক ইসলাম গ্রহন করতো এবং কুরাইশদের অত্যাচার নির্যাতনে পিষ্ট হতো, তাদেরকে দেখলেই কুরাইশরা তাদের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে দিয়ে বলতোঃ “ এই হুজুরদের কথা কি আর বলবো, এরাঁ নাকি আরব-আজমের শাসক হবেন!”

বিদ্রুপ, উপহাস, বিরোধীতা ও প্রতিরোধের মাত্রা যতই বাড়ুক, কুরাইশ গোত্রের বিচক্ষণ লোকেরা অন্তরের অন্তস্থল থেকে নির্ঘাত উপলব্ধি করছিল যে, এ আন্দোলন কোন মামুলী জিনিস নয়, বরং এর অত্যন্ত সুদূর প্রসারী ফলাফল দেখা দিতে বাধ্য। একবার মক্কার শীর্ষ স্থানীয় কুরাইশ নেতারা উতবাকে রাসুলুল্লাহর সা. সাথে আলাপ আলোচনার জন্য পাঠালো। উৎবা সরকারী পদ, ধন-সম্পদ ও দুনিয়াবী স্বার্থ সংক্রান্ত সম্ভাব্য সব রকমের লাভজনক জিনিস দেয়ার প্রলোভন দেখালো, যাতে রসূল সা. কোন রকমে এই বিপ্লবী কর্মকান্ড পরিত্যাগ করতে রাজী হয়ে যান। তবে রাসূল সা. উৎবাকে সুরা হা-মীম এর প্রথম কয়েকটি আয়াত শুনিয়ে দিলেন। এর ফলে উৎবার চেহারাই বিবর্ণ হয়ে গেল। সে গিয়ে বললোঃ এ দাওয়াত তো একটা বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ। একটা বিপ্লব ঘনিয়ে আসবে এবং সমাজ জীবনের সব কিছু ওলট পালট হয়ে যাবে। তাই সে পরামর্শ দিল যে, মুহাম্মদকে (সা.) তোমরা কিছু বলো না। সে যা করছে তা করতে দাও। বাধা দিও না। আরবের জনগণ যদি তাকে মেরে ফেলে, তাহলে তোমরা তার থেকে এমনিতেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে। আর যদি সে বিজয়ী হয়, তার রাজত্ব তোমাদেরই রাজত্ব হবে, তার মর্যাদা তোমাদেরই মর্যাদা হবে, এবং তোমরা বিশ্বে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী হবে।’ অথ্যাৎ কিনা উৎবার মত লোকও বুঝে ফেলেছিল যে, এই আন্দোলনের পশ্চাতে একটা সাম্রাজ্য লুকিয়ে রয়েছে। এবং এর পরণতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়া আর কিছু নয়। সে যখন টের পেয়েছে, তখন রাসুল সা. ও তার সংগী সাথীরা কিভাবে টের না পেয়ে থাকবেন? (সীরাতে ইবনে হিসাম, ১ম জিল্দ, পৃঃ ৩১৪)

একবার যখন মুসলমানরা প্রচন্ড সহিংসতা ও নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন রাসূল সা. –এর সাথীরা তাঁর কাছে তাদের দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করলেন এবং ঐ অবস্থা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য দোয়া চাইলেন। রাসূল সা. প্রথমে তো তাঁদের বুঝালেন যে, আল্লাহর দ্বীনকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে পদে পদে কঠিন বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অতীতে যারা এ দায়িত্ব পালন করেছে তাদেরকে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে। অতঃপর পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে তাদেরকে সুসংবাদ শুনালেন যে, “আল্লাহর কসম, এ কাজে আল্লাহ একদিন অবশ্যই চূড়ান্ত সাফল্য দান করবেন।’ অতঃপর এই সাফল্যের বর্ণনা দিয়ে বলেনঃ

“এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ একাকী সানা থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত সফর করবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয়ে সে ভীত থাকবেনা।” [সীরাতে ইবনে হিসাম – প্রথম খন্ড, পৃঃ ৩১৪ (মুল আরবী পুস্তক)] অর্থাৎ পৃথিবীতে এমন এক ইনসাফপূর্ন সমাজ ও কল্যাণময় যুগ প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা চালূ হবে যে, আজ যেখানে ডাকাতি, রাহাজানি হত্যা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে, যেখানে মানব সন্তানকে দিনে দুপুরে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এবং প্রকাশ্যে নারীর সতীত্ব পর্যন্ত লুন্ঠিত হচ্ছে, সেখানে একজন ভ্রমণকারী সম্পূর্ণ একাকী নিশ্চিন্তে ও নির্ভয়ে যত্রতত্র ভ্রমণ করতে পারবে। কেউ তার জান মাল ও মান সম্ভ্রমকে স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখাবে না। আর একবার রসূল সা. বলেছিলেন যে, এমন একটা যুগ প্রায় আসন্ন, যখন লোকেরা নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই মক্কায় যাতায়াত করবে। [শিবলী নোমানঃ সীরাতুন্নবী, ২য় খন্ড, ৩ পৃষ্ঠা]

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে যেরূপ পরিষ্কার ও উজ্জল ধারনা এখানে ব্যক্ত করা হয়েছে, তা সত্যিই অতুলনীয়।

একবার রসূল সা. কা’বার চাবির রক্ষক উসমান বিন তালহাকে কা’বার দরজা খুলে দিতে অনুরোধ করলে উসমান সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলো। সে সময় দৃশ্যত চরম নৈরাজ্যজনক ও প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। তথাপি রসূল সা. বললেন, 'সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন এই চাবি আমাদের হাতে থাকবে এবং আমরা যাকে দিতে চাইবো দিবো। [আল মাওয়াহিবুল লাদুনীয়া, কাসতালানী, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৮]

আকাবা নামক স্থানে মদীনার আনসারদের কাছ থেকে যে ঐতিহাসিক অংগীকার বা বায়আত নেয়া হয়েছিল, তা অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ইসলামের প্রচারজনিত বিরোধ ও সংঘাত যে কত ব্যাপক ও সুদূর প্রসারী হয়, তা আনসাররাও উপলব্ধি করেছিলেন। তারা এটাও উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই বিরোধের চূড়ান্ত ফয়সালা পরবর্তীতে যুদ্ধের ময়দানেই হবে। এই অংগীকারের মধ্য দিয়ে একদিকে আনসারগণ রাসূল সা. এর সমর্থনে প্রয়োজনে সারা বিশ্বের সাথে যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দেন এবং নিজেদের সরদারদের ধ্বংশ ও জানমালের বিনাশকেও স্বাগত জানান। অপরদিকে রাসুল সা. এর কাছে থেকেও তারা প্রতিশ্রুতি আদায় করেন যে, আল্লাহ যখন আপনাকে বিজয়ী করবেন, তখন যেন আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন না। এই যে যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি, ত্যাগ ও কুরবানীর সংকল্প এবং বিজয়ের স্বপ্ন- এ সবের মধ্যে কি রাসূলের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। [সীরাতে ইবনে হিসাম (আরবী), ২য় খন্ড, পৃ: ৫০, ৫১, যাদুল মায়াদ (আরবী) ১ম খন্ড, পৃ: ৫০,৫১]

হিজরতের জন্য যাত্রা শুরু করার আগে তাকে যে দোয়া শেখানো হয় তার শেষাংশ হলো, ”আর তোমার পক্ষ থেকে কোনো রাষ্ট্র শক্তিকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও” [সুরা বণী ইসরাঈণ, আয়াত ৮০]

এ আয়াতে তাঁকে ’সহায়ক শক্তি’ প্রার্থনা করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। অথার্ৎ এই পবিত্র মিশনের পৃষ্ঠপোষকতা ও এই মহতী লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শাসন ক্ষমতার প্রয়োজন বিধায় শাসন ক্ষমতা প্রার্থনা করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

চাচা আবু তালেবের ওপর রাসূল সা. – এর সাফল্য ও সমর্থন পরিত্যাগ করার জন্য যখন চাপ সৃষ্টি করা হলো, তখন তিনি রসূল সা. কে বললেন, আমার জন্য সমস্যার সৃষ্টি করো না। এই সময়ে রাসূল সা. যে জবাব দেন তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ’ওরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয়, তবুও আমি আমার এ লক্ষ্য পরিত্যাগ করবো না।” তার জবাবের শেষ কথাটা ছিল এই- ”হয় আল্লাহ আমার এই লক্ষ্যকে বিজয়ী করবেন, নচেৎ এ কাজ করতে করতেই আমি মৃত্যু বরণ করবো।” [সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড ২৭৮]

এখানে তিনি 'বিজয়ী করবেন’ বলেছেন, 'সম্পূর্ণ করবেন’ বলেননি। 'বিজয়ী' শব্দটার মধ্যেই দ্বন্দ-সংঘাতের ধারনা বিদ্যামান। আর তাঁর শেষ বাক্যটি থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, এই দ্বন্দ-সংঘাতের তীব্রতা ছিল জীবনের ঝুকি পর্যায়ের।

হিজরতের পর আদী ইবনে হাতেম রাসূল সা.-এর কাছে এসে তার ব্যক্তিত্ব পরখ করতে লাগলেন। তিনি তারঁ দাওয়াতের ধারণা কী জানতে চেষ্টা করলেন এবং সমালোচকের দৃষ্টিতে তার চলন বলন পর্যবেক্ষন করলেন। আর এ কাজ করতে গিয়েই তার হৃদয় হয়ে পড়লো অভিভূত ও মুগ্ধ। আগন্তুকের চিন্তাধারার সাথে সংগতি রেখে তিনি তাকে জানালেন যে, ভবিষ্যতে বাবেলের সাদা ভবনগুলো ইসলামের অধীনে চলে আসবে, এখানে বিপুল ধনসম্পদ বিরাজ করবে এবং মুসলমানরা অসাধারন ক্ষমতা ও প্রতাপের অধিকারী হবে। সেই সাথে তিনি তাকে ইসলামী ইনসাফপূর্ণ সমাজব্যবস্থার এই বৈশিস্ট সম্পর্কেও অবহিত করলেন যে, অচিরেই তুমি দেখবে- এক মহিলা সুদূর কাদেসিয়া থেকে একাকী একটি উঠে সওয়ার হয়ে এই মসজিদ অভিমুখে রওনা হয়েছে এবং সম্পূর্ন নিরাপদে এখানে এসে পৌছেছে। বাহ্যত একেবারেই নিস্ব অবস্থায় হিজরতের সফরে যে নবীর দৃষ্টি সুরাকার হতে পারস্য সম্রাটের কংগন শোভা পেতে দেখেছে, তাঁর সম্পর্কে এ কথা কিভাবে বলা যায় যে, নিজের আন্দোলনের শেষ পরিনতি ও নিজের সূচিত নতুন সমাজ ব্যবস্থার চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন না? এ কথা কিভাবে কল্পনা করা সম্ভব যে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, তার জন্য প্রস্তুতি ও সংগ্রাম করা হয়নি এবং তা নিছক পুরস্কার হিসাবে আকস্মিকভাবে রাসূল সা. এর সংগঠন কে দেওয়া হয়েছে? বলতে চাইলে বড়জোর এতটুকু বলা যায় যে, কেবল পার্থিব স্বার্থ ও ব্যক্তিগত প্রতাপ ও পরাক্রম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি রাষ্ট্র ও সরকার কায়েম করতে চাননি। কিন্তু আল্লাহর দ্বীনকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করা, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ কায়েম করা, মানবতার মুক্তি নিশ্চিত করা এবং সমাজ গঠনের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র কাম্য ছিল না, একথা কেমন করে বলা যায়?

আসলে শুধু আকীদাগত ও নৈতিক বিপ্লব সাধনই রাসূল সা. এর উদ্দেশ্য ছিল না, বরং সেই সাথে পূর্ণ গুরুত্ব সহকারে রাজনৈতিক বিপ্লব সাধনও তাঁর লক্ষ্য ছিল। ব্যক্তির সংশোধনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কারও তার কাম্য ছিল। অন্য কথায় বলা যায়, রাসূল সা. মানুষকে একটা সামষ্টিক সত্তা বা সমাজবদ্ধ জীব হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। এবং তার সকল সামাজিক সম্পর্ক সহ তাকে সংশোধন করতে চেয়েছিলেন। রাসূল সা. মানুষকে সমাজ থেকে বিছিন্ন করে শুধু ব্যক্তি হিসাবেও বিবেচনা করেননি। এবং তার দাওয়াতকেও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখেননি। এই বিষয়টি যদি স্বরণ রাখা হয় এবং রসূল সা. এর আগমনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে যদি তার সমস্ত ব্যাপকতা সহকারে অন্তরে বদ্ধমূল করা হয়, তাহলে সীরাতের ঘটনাবলীতে পরিপূর্ণ ধারাবাহিকতা পরিলক্ষিত হবে এবং প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রতিটি উদ্যোগের ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। অন্যথায় সীরাতের রহস্যও উদ্ঘাটিত হবে না, এবং পবিত্র কোরআনের বক্তব্যও স্পষ্ট হবে না।

-লিখেছেন নঈম সিদ্দিকী

No comments :

Post a Comment